বিলুপ্তির পথে স্বর্ণলতা গাছ

EkattorPost Desk

মোহাম্মদ আমিনুল হক বুলবুল, নান্দাইল

২২ নভেম্বর ২০২২, ০৩:০৪ পিএম


বিলুপ্তির পথে স্বর্ণলতা গাছ

ছবিঃ সংগৃহীত

একাত্তর পোস্ট অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

'স্বর্ণলতা' কবিতায় কবি শ্যামপূলক লিখেছেন-

স্বর্ণলতা তুমি বেঁচে থাকো
অন্যের  আস্রয়ে
ভয়ে বা অভয়ে।
আমি তাকিয়ে থাকি বিস্ময়ে।

তোমার সোনালী রঙের আবেশ,
জড়িয়ে রাখার,
আঁকড়ে ধরার
ক্ষমতা আমাকে মুগ্ধ করে।

একসময় গ্রামীণ পথের ধারে গাছে গাছে জালের মত বিস্তার করত স্বর্ণলতা। বাড়ির পাশে, পথের ধারে, বনে-জঙ্গলে সর্বত্র চোখে পড়তো স্বর্ণলতা। সব মানুষই এ লতা চেনে। এখন স্বর্ণলতার বাসযোগ্য না থাকায় প্রকৃতি থেকে তা হারিয়ে যাচ্ছে।

ময়মনসিংহের নান্দাইলেও তেমন চোখে পড়ে না স্বর্ণলতা। শীতের পাতা ঝরা প্রকৃতিতে মোহনীয় সৌন্দর্য ছড়ায় স্বর্ণলতা। দূর থেকে দেখলে মনে হয় ঝুরি ঝুরি হলদে সুতা ঝুলে আছে। এর উপরে রোদ পড়লে চকচক করে। গ্রামে এখন খুব কমই দেখা যায় এই স্বর্ণলতা।

স্বর্ণলতা হলুদ-সোনালি রঙের, নরম ও সরু। পত্রহীন হলেও শাখা-প্রশাখা অসংখ্য। সাধারণত ছোট ও মাঝারি উচ্চতার গাছ বা বেড়ার গাছে জোঁকের মতো জড়িয়ে থাকে। এভাবে আশ্রয়দাতা গাছের কাণ্ডে নিজের মূল কাণ্ড গেঁথে তার সাহায্যে খাদ্য সংগ্রহ করে।

তারপর নিজের শাখা-প্রশাখায় জড়িয়ে নেয় গাছটিকে। একসময় এর মূল বা কাণ্ড আর খুঁজে পাওয়া যায় না। বসন্ত-গ্রীষ্মে পত্রহীন লতায় ছোট মঞ্জরিদণ্ডে সাদা রঙের ফুল ফোটে। দেখতে অনেকটা ছোট বাতির মতো, মাথায় পাঁচ পাপড়ি, পরাগকেশর অনেকটাই অদৃশ্য। বোঁটা বেশ ছোট এবং গুচ্ছবদ্ধ। ফল পাকে বসন্তের শেষে বা বর্ষায়।

স্বর্ণলতা একটি পরজীবী উদ্ভিদ। অনেকেই একে আলোকলতা বা শূন্যলতা হিসেবেও চেনে। সোনালী রং এর চিকন লতার মত বলে এইরূপ নামকরন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কুল (বরই), বাবলা, ইত্যাদি কাঁটাবহুল গাছে জন্মাতে দেখা যায়। রসালো কাণ্ড পত্রবিহীন, সোনার মত রং, আকর্ষণীয় চেহারা। কোন পাতা নেই, লতাই এর দেহ, কাণ্ড, মূল সব। উদ্ভিদটিকে বাংলায় বলা হয় স্বর্ণলতা। এর বৈজ্ঞানিক নাম Cuscuta Reflexa।

পৌষ ও চৈত্রে এ লতা বেড়ে ওঠে এবং জালের মতো বিস্তার ঘটায়। দেশের সর্বত্রই স্বর্ণলতা্র উপযোগী আবাসস্থল। ফলে নির্ভরশীল গাছে আপনমনে জন্মায়। স্বর্ণলতা পরজীবী উদ্ভিদটির পুরো কাণ্ডই বিষাক্ত। বিষক্রিয়ার ধরণগুলো হলো প্রজনন ক্ষমতারোধি, বমন সৃজক, গর্ভপাতক।

হলুদ, কমলা ও লাল রঙের বিভিন্ন প্রজাতি আছে। এ পর্যন্ত প্রায় ১৭০ প্রজাতির লতার সন্ধান পাওয়া গেছে। অন্য গাছের ওপর নির্ভর করেই এরা বেড়ে ওঠে। শাখা লতার মাধ্যমে পোষক গাছকে খুব কম সময়ে জড়িয়ে ফেলতে পারে। পোষক গাছের কাণ্ডে নিজের কাণ্ড গেঁথে তার সাহায্যে খাদ্য সংগ্রহ করে। অনেক সময় পোষক গাছের মৃত্যুও ঘটায় এ লতা। তাই উপকারী গাছে এদের বেড়ে উঠতে দেওয়া হয় না।

কবি মাইকেল মধুসূধন দত্ত "রসাল ও স্বর্ণলতিকা" কবিতায় লিখেছেন,

রসাল কহিল উচ্চে স্বর্ণলতিকারে;-
শুন মোর কথা, ধনি, নিন্দ বিধাতারে।
নিদারুণ তিনি অতি;
নাহি দয়া তব প্রতি;
তেঁই ক্ষুদ্র-কায়া করি সৃজিলা তোমারে।

শীতের সময় সাদা রঙের ফুল ফোটে। ফুল থেকে ফল হয়, ফল থেকে বীজ পেয়ে আবার বংশ বিস্তার করে। এদের বীজ ও কাণ্ড বিভিন্ন রোগের ওষুধ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়।

স্বর্ণলতায় আছে নানা ঔষধি গুণ। এটি বায়ুনাশক ও পেট ব্যথায় কার্যকর। জন্মনিরোধ ও কৃমিনাশক হিসেবে কাজ করে থাকে। স্বর্ণলতার নির্যাস পেট ফাঁপা ও কোষ্ঠ কাঠিন্যে দারুণ উপকারী। আয়ুর্বেদ চিকিৎসায় স্বর্ণলতা ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসায় একে রক্তদৃষ্টিনাশক, পিত্ত ও কফনাশক, বিরেচক, বায়ুনাশক, কৃমিনাশক, খোসপাঁচড়া নিবারণকারী হিসেবে দেখা যায়।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হাড়ের চিকিৎসা, জন্ডিস, রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, যকৃতের রোগ, চুলকানি, শ্বাসকষ্ট, ক্যান্সার ইত্যাদি কঠিন রোগ নিরাময়ে স্বর্ণলতার ব্যবহার সম্পর্কে জানা যায়। বর্তমান গবেষণায় এন্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে এটি অন্যতম বলে বিবেচিত হয়েছে।

নান্দাইল উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান বলেন, প্রকৃতি থেকে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে শোভাবর্ধক এই স্বর্ণলতা। নির্বিচারে বনে-জঙ্গল উজার এবং এর ঔষধি গুণ সম্পর্কে না জানার কারণে মানুষ স্বর্ণলতার বংশবিস্তার ধ্বংস করছে।

Link copied